রাণাঘাট থেকে কলকাতা — দূরত্ব মাত্র সত্তর কিলোমিটার। ট্রেনে প্রায় দুই ঘণ্টা। কিন্তু এই দুই ঘণ্টার পথই একজন নাস্তিক যুবককে ভারতের অন্যতম শ্রেষ্ঠ আধ্যাত্মিক শহরের সাথে যুক্ত করেছিল। কলকাতা তাঁকে শিক্ষা দিয়েছিল, পরীক্ষা নিয়েছিল, এবং একটি গভীর সত্য শিখিয়েছিল।
প্রথম মেট্রো, প্রথম বিস্ময়
ছোটবেলায় মায়ের হাত ধরে প্রথম কলকাতা। গন্তব্য — দমদম ক্যান্টনমেন্ট, কাকার বাড়ি।
এবং সেই প্রথমবার — মেট্রোরেল। কলকাতা মেট্রো ভারতের প্রথম মেট্রোরেল — ১৯৮৪ সালে চালু হয়েছিল। রাণাঘাটের ছেলে যে কখনো মাটির নিচে যায়নি, সে সেদিন মাটির নিচ দিয়ে কলকাতা দেখল। শহর মানে শুধু বড় বাড়ি নয় — শহর মানে অন্যরকম একটি পৃথিবী। সেই প্রথম বিস্ময়ের স্মৃতি আজও অম্লান।
শিয়ালদহ থেকে সুখিয়া স্ট্রিট — জ্ঞানের পথ
বছর কয়েক পরে। এবার একা। এবার উদ্দেশ্য আলাদা। প্রতি সপ্তাহে — কখনো শনিবার, কখনো রবিবার — রাণাঘাট থেকে শিয়ালদহগামী ট্রেন। কানে হেডফোন। কিন্তু গান নয় — রাতে পড়া জ্যোতিষের সূত্র নিজের গলায় রেকর্ড করা, সেই রেকর্ডিং বারবার শুনছেন। শিয়ালদহ থেকে রাণাঘাটে ফেরার দুই ঘণ্টার ট্রেন যাত্রা ছিল তখনকার চলমান পাঠশালা।
শিয়ালদহ স্টেশন থেকে সুখিয়া স্ট্রিট — আশুতোষ শীল লেনে বিশ্ব জ্যোতিষ বিদ্যাপীঠ। সময় থাকলে হেঁটে, না হলে বাসে। ব্রাহ্মো বয়েজ হাই স্কুলে ক্লাস। এখানেই শুরু — লগ্ন নির্ণয়, পঞ্চাঙ্গ গণনা, গ্রহস্ফুট নির্ণয়, হস্তরেখা বিশ্লেষণ। দমদম রবীন্দ্র ভবনে বার্ষিক অনুষ্ঠানে সম্মানের সাথে প্রথম সার্টিফিকেট হাতে পেলেন।
SKAVSA — South Kolkata Astrology & Vastu Science Academy (সংস্থার নাম জ্যোতিষ্ক) ভবানীপুর, দক্ষিণ কলকাতায়। ২০০০-২০০১ সালে প্রতিষ্ঠিত। Diploma, BA, MA, M.Phil ও PhD in Astrology পরিচালনা করে। ওয়েবসাইট: skavsa.in
পরের পর্বে — দক্ষিণ কলকাতা। নেতাজী ভবন মেট্রো স্টেশন নেমে SKAVSA — জ্যোতিষ্ক। সাউথ সাবার্বান স্কুলে ক্লাস। সুজাতা দেবী স্মৃতি সদনে সনদপ্রদান অনুষ্ঠান।
এখানেই বিদ্যা জ্যোতিষ আচার্য (MA)-তে ২য় রুপোপদক, বিদ্যা জ্যোতিষ বাচস্পতি (M.Phil)-এ ২য় রুপোপদক এবং সর্বশেষ বিদ্যা বারিধি (PhD)-তে স্বর্ণপদক। এবং পৃথকভাবে Gem Therapist, Palmistry ও Numerology-তে সার্টিফিকেট। রাণাঘাটের সেই দরিদ্র ছেলে কলকাতার মাটিতে দাঁড়িয়ে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পেল।
কালীঘাট চেম্বার — বিবেক ও উপলব্ধি
ভবানীপুরে ক্লাস শেষে বন্ধুরা মিলে হেঁটে যেতেন মুখ্যমন্ত্রীর বাড়ির সামনে দিয়ে — কালীঘাট কালী মন্দির। ৫১ পীঠের অন্যতম এই জাগ্রত মন্দিরে মাঝে মাঝে পুজো দিতেন। নিপ্পনজান মিয়োহোজি বৌদ্ধ মন্দিরেও গেছেন — সেই শান্ত পরিবেশ মুগ্ধ করেছিল।
একদিন সেই কালীঘাট মন্দিরের সামনে ১ নম্বর গেটের কাছে — মঙ্গল ভবনের দোতলায় — একটি চেম্বার নিলেন। কলকাতায় প্র্যাকটিস শুরু।
কিন্তু কলকাতা শেখাল এক কঠিন সত্য। হাজারো জ্যোতিষীর ভিড়ে নিজেকে ছোট মনে হতো। চেম্বার ভাড়া, বিজ্ঞাপন, যাতায়াত — এই খরচ তুলতে গিয়ে অবচেতনে মানুষকে সেবা নয়, শোষণের দিকে মন যাচ্ছিল। বিবেক প্রশ্ন করছিল।
তখন মনে এলো এক গভীর উপলব্ধি —
চেম্বার ছাড়লেন। রাণাঘাটে ফিরলেন। নিজের মাটিতে, নিজের শর্তে। এবং তারপর থেকে কলকাতার মানুষ ট্রেনে করে রাণাঘাটে আসেন — দুই ঘণ্টার পথ পাড়ি দিয়ে।
কলেজ স্ট্রিট, দক্ষিণেশ্বর ও ভাগীরথীর পাড়
কলেজ স্ট্রিট। পুরনো বইয়ের গন্ধ। এশিয়ার বৃহত্তম বইয়ের বাজার। বৃহৎ পারাশর, ফলদীপিকা, উত্তর কালামৃত — যে শাস্ত্রীয় জ্যোতিষ গ্রন্থ অন্য কোথাও মেলে না, এখানে পাওয়া যায়।
দক্ষিণেশ্বর কালী মন্দির। ভাগীরথীর তীরে এই মন্দিরে শ্রী রামকৃষ্ণ পরমহংসদেব দীর্ঘ বছর সাধনা করেছেন। একবার রাত জেগে কলকাতার দুর্গাপুজোর প্রতিমা দেখলেন, ভোরবেলায় মায়ের দর্শন করে বাড়ি ফিরলেন।
রামকৃষ্ণ মিশন দর্শন — সেখানকার অনুষ্ঠান দেখার সুযোগ হয়েছে। নাস্তিক নরেন্দ্রনাথ দত্ত রামকৃষ্ণের কাছে প্রশ্ন করেছিলেন — "ঈশ্বর দেখা যায় কি?" — এবং স্বামী বিবেকানন্দ হয়ে ফিরেছিলেন। এই গল্পটি ড. আচার্যকে গভীরভাবে অনুপ্রাণিত করে।
মাতা সারদা দেবীর সেই সরল বাণী — "সয় সেই রয়" — স্বামীজির ব্যাখ্যায় বুঝেছেন। মানুষের সহনশীলতা কমে গেলেই জীবন কঠিন হয়।
কাচরাপারা — রাণী রাসমণির ঘাট। ভাগীরথীর পাড়ে। রামপ্রসাদের ঘাটের কাছে শ্মশানে বসে যা ভাবেন —
২০২৫ সালের শিবরাত্রিতে সপরিবারে রাণী রাসমণির নির্মিত মন্দিরে মহাদেবের আরাধনা।
ট্রাম, হাওড়া ব্রিজ এবং শহরের আত্মা
ট্রাম। টংটং করে ঘণ্টা বাজিয়ে কলকাতার বুকে চলে। জানালা থেকে শহর দেখা — এ যেন স্বপ্নের মতো। কলকাতার ট্রাম ভারতের একমাত্র টিকে থাকা ট্রামওয়ে ব্যবস্থা — ১৮৭৩ সালে চালু হয়েছিল।
হাওড়া ব্রিজ পায়ে হেঁটে পার হওয়া — নিচে ভাগীরথী বয়ে যাচ্ছে। ১৯৪৩ সালে নির্মিত এই সেতু বিশ্বের অন্যতম ব্যস্ততম ক্যান্টিলিভার সেতু। গড়িয়াহাট মোড়ে ঘুরে ঘুরে কেনাকাটা। টালিগঞ্জে বন্ধুদের সাথে আড্ডা।
ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল, ইন্ডিয়ান মিউজিয়াম, সায়েন্সসিটি, আলিপুর চিড়িয়াখানা — পরিবার নিয়ে ঘুরেছেন বারবার। শিয়ালদহ স্টেশনে চায়ের কাপ হাতে দাঁড়িয়ে থাকা — কলকাতায় গেছেন অথচ চা খাননি, এমন কখনো হয়নি।
রবীন্দ্রনাথ, নজরুল ও বাবার গল্প
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর সম্পর্কে তিনি বলেন — "বাঙালি হয়ে জন্ম নিয়ে রবীন্দ্রনাথকে উপলব্ধি না করলে মানব জনম বৃথা।" রবীন্দ্রনাথের "দীন ও দান" পড়ে মনে পড়ে বাবার গল্প — এক ঋষি তীর্থস্থান নির্মাণ করলেন। বললেন এখানে মৃত্যু হলে স্বর্গ। দেবতারা বারবার প্রশ্ন করে বিরক্ত করতে লাগলেন। শেষে ক্রুদ্ধ ঋষি বললেন — "শুয়োর হবে।" দেবতা বললেন — তথাস্তু। অসময়ে উচ্চারিত শব্দ কীভাবে জীবন বদলায় — এই উপলব্ধি পঞ্চাঙ্গ গণনার দর্শনের সাথে সংযুক্ত।
কাজী নজরুল ইসলামের ব্যথা না পড়েও অনুভব করা যায়। তাঁর লেখা একবারে পড়া যায় না —
অস্তপারের সন্ধ্যাতারায় আমার খবর পুছবে —
বুঝবে সেইদিন বুঝবে! — কাজী নজরুল ইসলাম
কলকাতার শিল্পপতি দম্পতির গল্প
এক শিল্পপতি তাঁর স্ত্রীকে নিয়ে রাণাঘাট চেম্বারে এসেছিলেন। হস্তরেখা ও জন্মকুণ্ডলী বিশ্লেষণের পাশাপাশি অনেক কথা হলো জীবন নিয়ে। ড. আচার্য বলেছিলেন —
সেই দম্পতি গভীরভাবে প্রভাবিত হয়েছিলেন। তিনি বলেন — "চানক্য বলেছিলেন, সুবেশ মূর্খও সম্মান পায় যতক্ষণ মুখ না খোলে। আমি মুখ খুলি — এবং কলকাতার মানুষ পথ খুঁজে পান।"
উপসংহার — জ্ঞানের শহর, সেবার শপথ
কলকাতা ড. প্রদ্যুৎ আচার্যকে শিখিয়েছে — জ্ঞান বিক্রি হয় না, অনুভব করা যায়। ইঁদুরের দৌড় থেকে সরে এসে নিজের মাটিতে, নিজের শর্তে কাজ করাই সঠিক পথ। এবং কলকাতার মানুষ — যারা যুক্তিবাদী, সচেতন, প্রশ্নকারী — তারা সেই সত্যিকারের জ্ঞানের জন্য দুই ঘণ্টার পথ পাড়ি দেন।