ভাগীরথীর পশ্চিম তীরে, নবদ্বীপের পুণ্যমৃত্তিকায় গড়ে ওঠা নদিয়া — পশ্চিমবঙ্গের এই জেলাটি কেবল একটি ভৌগোলিক সীমারেখা নয়। নদিয়া হলো একটি দর্শনের নাম, আত্মজিজ্ঞাসার নাম।
এই মাটিতে পাঁচশো বছর আগে এক তরুণ পণ্ডিত তর্কের ময়দানে দাঁড়িয়ে প্রশ্ন করেছিলেন — ঈশ্বর কি সত্য? যুক্তিতে কেউ তাঁকে হারাতে পারত না। তাঁর নাম ছিল নিমাই পণ্ডিত। পরে মানুষ তাঁকে চিনেছে শ্রীচৈতন্য নামে। তাই এই মাটিতে প্রশ্ন রাখলে উত্তর পাওয়া যায় এবং চৈতন্য লাভ হয়।
এই একই মাটিতে, বহু শতাব্দী পরে, একটি দরিদ্র পরিবারের ছেলে প্রশ্ন করেছিল — জ্যোতিষ কি ছলনা? যুক্তিতে জ্যোতিষকে সে ভুল প্রমাণ করতে চেয়েছিল। পারেনি। বরং উল্টো পথে হেঁটে সত্যের কাছে পৌঁছে গেছে। তাঁর নাম প্রদ্যুৎ আচার্য।
নদিয়ার মাটি এভাবেই মায়ের মতো সন্তানদের শেখায় — প্রশ্ন করো, ভয় পেও না। প্রশ্নই পথ দেখাবে।
চূর্ণীর পাড়ের রাণাঘাট শহর
রাণাঘাট। চূর্ণী নদীর পাড়ে গড়ে ওঠা এক শহর।
লোকমুখে শোনা যায় রানা নামে এক ডাকাত এই নদীর ঘাটে থাকত — সেই থেকেই এই শহরের নাম রাণাঘাট। এই গল্পই লোকমুখে প্রচলিত। এই শহরে টিকে আছে চূর্ণীর পূর্ব পাড়ে পাল চৌধুরীদের প্রাচীন ভবনের ধ্বংসাবশেষ — নীরবে ইতিহাসের সাক্ষ্য দিচ্ছে।
রাণাঘাটের পূর্বে মাত্র তিন কিলোমিটার দূরে কুপার্স ক্যাম্প শহর। ব্রিটিশ আমলে কোনো কুপার বা কুপার্স সাহেবের নামে এই জায়গার নাম। সেই একই জায়গা ১৯৭১ সালে হয়ে উঠেছিল হাজার হাজার শরণার্থীর আশ্রয়স্থল। ইন্দিরা গান্ধীর সরকার এখানে শিবির করেছিল — অত্যাচারের শিকার হয়ে নিজের মাতৃভূমি, জন্মভিটেমাটি ছেড়ে আসা মানুষগুলো এখান থেকেই নতুন জীবন শুরু করেছিল।
এই কুপার্স ক্যাম্পেই আছে মা করুণাময়ী কালী মন্দির। ভাদ্র মাসে চৌষট্টি প্রহর হরিনাম সংকীর্তন — প্রায় দশদিনের উৎসবে হাজারো মানুষের ভিড়। এছাড়াও সারা বছরই নানা উৎসবের মেলা এখানে। এই মন্দিরের চত্বরে — বিশ বছরেরও বেশি সময় ধরে প্রতি সন্ধ্যায় এক যুবকের আড্ডা বসত। সেই যুবকের জীবনে এই জায়গার কথা জিজ্ঞেস করলে সে শুধু কবিতায় বলে —
তেমনই কারও টানে আমার মনটা ছিলো বাঁধা।
চলে গেছে দিনগুলো সব, এবং সবই গেছি ভুলে,
বলবো না আর কোনো কিছুই পুরনো কথা তুলে। — ড. প্রদ্যুৎ আচার্য
একজন নাস্তিকের জন্ম
ছোটবেলা থেকেই প্রদ্যুৎ আচার্য ছিলেন প্রশ্নবাদী। ঈশ্বরের প্রতি ছিল গভীর অবিশ্বাস। জ্যোতিষকে বলতেন কুসংস্কার। পরিবারে অভাব ছিল — তাই ছোটবেলা থেকেই কাজ করতেন, নিজের পথ নিজে তৈরি করতেন।
কিন্তু বারবার ব্যর্থ হচ্ছিলেন। কাজ করছেন, পরিশ্রম করছেন — তবু কেন উন্নতি নেই? একদিন মনের গভীর থেকে একটা প্রশ্ন উঠল —
এই প্রশ্নটাই সব বদলে দিল। তর্কের জন্যই পড়া শুরু। জ্যোতিষের প্রবঞ্চনার রহস্য ধরতে হবে — তাই জ্যোতিষ পড়তে হবে। প্রথমে চটি বই। তারপর ধীরে ধীরে শাস্ত্রীয় গ্রন্থ — বৃহৎ জাতকম, লঘু পারাশর হোরাশাস্ত্র, ফলদীপিকা, উত্তর কালামৃত, ভাবার্থরত্নাকর।
এবং একদিন — গ্রহের সূত্র মানুষের স্বভাবের সাথে মিলতে শুরু করল। নিজের কুণ্ডলীতে নিজেকে খুঁজে পেলেন। কর্কট লগ্ন, কন্যা রাশি — জীবনের প্রতিটি বাঁকের ব্যাখ্যা যেন গ্রন্থের পাতা থেকে বেরিয়ে বাস্তবে দাঁড়াল।
খণ্ডন করতে গিয়ে আবিষ্কার করলেন — এটা বিজ্ঞান।
চৈতন্যের মাটির দর্শন — সত্যের পথে যুক্তি
নবদ্বীপ থেকে রাণাঘাটের দূরত্ব মাত্র কয়েক কিলোমিটার।
পাঁচশো বছর আগে এই নবদ্বীপেই নিমাই পণ্ডিত নদীর ঘাটে তর্কে বসতেন। কেউ তাঁকে হারাতে পারত না। তাঁর যুক্তির কাছে পণ্ডিতেরা নতিস্বীকার করতেন। কিন্তু সেই যুক্তিবাদী মানুষটিই একদিন অনুভব করলেন — কিছু সত্য যুক্তির ঊর্ধ্বে।
প্রদ্যুৎ আচার্যও ঠিক এই পথেই হেঁটেছেন। Nietzsche, Schopenhauer, Camus, Osho-র মতো দার্শনিকদের পড়ে পৃথিবীকে নতুন করে দেখতে শিখেছেন। শিখেছেন — যেকোনো বিষয়ের পক্ষে ও বিপক্ষে সমান শক্তিশালী যুক্তি আছে। তাই কিছু কিছু বিষয় শুধু যুক্তিতে মেলে না — অনুভব করতে হয়।
এটা শুধু ভক্তির কথা নয় — এটা জীবনদর্শন। বিরুদ্ধতাকেও ভালোবেসে এগিয়ে যাওয়ার কথা।
গানের মাঝেও জ্যোতিষ দর্শন
নদিয়ার মাটিতে আরেক কণ্ঠস্বর বেঁচে আছে — অশ্বিনী গোসাঁই।
মতুয়া ভক্তিধারার এই ভক্ত এমন কথা লিখেছেন যা দার্শনিকের মতো গভীর, কিন্তু সাধারণ মানুষের বুকে সরাসরি পৌঁছায়। প্রদ্যুৎ আচার্য বলেন, "অশ্বিনী পাগল — আর সে আমাকেও পাগল করেছে।"
একটি মাছ যেমন বিশাল সাগরের সম্পূর্ণ রহস্য জানতে পারে না, মানুষও তেমনি জীবনের সব উত্তর জানে না। এই বিনম্রতাই জ্যোতিষের সঠিক অবস্থান — সে সব জানে না, কিন্তু মহাজাগতিক মানচিত্রের সাহায্যে কিছুটা আলো দেখাতে পারে।
কারও বুকের মানিক কাইরা নিয়ে দুঃখ সাগরে ভাসালি। — অশ্বিনী গোসাঁই
এই গান শুনলে বোঝা যায় — জীবন অসাম্য ও বেদনায় ভরা। জ্যোতিষ সেই বেদনার সামনে দাঁড়িয়ে পথ দেখায়।
তোমারে বাসিবো ভালো সেই ভিক্ষাই চাই। — অশ্বিনী গোসাঁই
ভাগ্য যাই হোক — কর্ম ও প্রেমের পথে থাকো। এটাই ড. প্রদ্যুৎ আচার্যের জ্যোতিষচর্চার মূল কথা।
সিসিফাস ও জ্যোতিষী
Camus-এর Sisyphus। পাথর গড়িয়ে পড়বে — আবার তুলবে — আবার পড়বে। এটাই নিয়তি। কিন্তু Camus বলেছেন — Sisyphus happy। সে জানে পাথর পড়বে, তবু তুলছে। এটাই বীরত্ব।
দারিদ্র্য থেকে শুরু। বারবার ব্যর্থতা। তবু থামেননি। Viswa Jyotish Vidyapeeth, কলকাতায় ভর্তি হয়েছেন। তারপর SKAVSA — Certificate, Diploma, MA-তে রুপো পদক, M.Phil-এ রুপো পদক, PhD-তে স্বর্ণপদক। নদিয়ার মাটির এক দরিদ্র ছেলে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পেয়েছেন।
নদিয়ার মানুষ, ড. আচার্যের অভিজ্ঞতা
পনেরো বছরেরও বেশি সময়ে ড. প্রদ্যুৎ আচার্যের কাছে এসেছেন ডাক্তার, বিচারক, সেনা অফিসার, শিল্পপতি। এসেছেন সন্দিগ্ধ নাস্তিকও।
মতুয়া সম্প্রদায়ের কথাও বলেন — "এরা হরিচাঁদ গুরুচাঁদ ঠাকুরকে মানে ঠিকই, কিন্তু তাঁদের শিক্ষা সম্পূর্ণ জানে না। জানলে এদের জীবন আরও অনেক বেশি উন্নত হতো।"
এই মাটির মানুষ তাঁকে ভালোবাসেন। রঞ্জিত দত্ত লিখেছেন — "উনি শুধু একজন জ্যোতিষী নন, একজন গভীর দার্শনিক চিন্তাবিদও বটে।"
উপসংহার — প্রশ্নের মাটি, আলোর পথ
নদিয়া এমন একটি মাটি — যেখানে প্রশ্ন করলে উত্তর মেলে।
নিমাই পণ্ডিত প্রশ্ন করেছিলেন — ভক্তি পেয়েছিলেন। প্রদ্যুৎ আচার্য প্রশ্ন করেছিলেন — জ্ঞান পেয়েছেন।
চূর্ণীর জল বয়ে যায়। কুপার্স ক্যাম্পে হরিনামের সুর ভাসে। অশ্বিনীর গান বুকে বাজে।
এই মাটিতে জন্মেছেন বলেই হয়তো প্রদ্যুৎ আচার্য বিশ্বাস করেন — ভাগ্য পাথরে লেখা নয়। সচেতন কর্ম, প্রেম ও প্রশ্নের মাধ্যমে জীবন বদলানো যায়।