সব পোস্ট দেখুন
অনন্তের গল্প: কষ্টের মাঝেও যে শিশু শিখিয়েছিল সুখী থাকার পথ

অনন্তের গল্প: কষ্টের মাঝেও যে শিশু শিখিয়েছিল সুখী থাকার পথ

প্রদ্যুত আচার্য MyAstrology Ranaghat জ্যোতিষী ও হস্তরেখাবিদ গ্রহণের দর্শন শিশুর প্রজ্ঞা জীবনসংগ্রাম সহিষ্ণুতা কর্মফল

অনন্তের গল্প: কষ্টের মাঝেও যে শিশু শিখিয়েছিল সুখী থাকার পথ

✍️ Dr Prodyut Acharya  |  📅 ৮ মার্চ ২০২৬  |  ⏱️ ৭ মিনিট


দুর্ভাগ্যের আঘাত নয়, বরং দৃষ্টিভঙ্গিই চিরকাল স্থির করে দেয় মানুষের সুখ বা দুঃখকে।

চায়ের দোকানে কাজ করা ছোট্ট ছেলেটির নাম অনন্ত। বয়স তার বারো। চার বছর আগে বাবা মারা গেছেন। একটি ছোট বোন আছে, বয়স আট। সংসারে তারা তিনজন — মা, বোন আর অনন্ত। মা লোকের বাড়ি কাজ করেন; বোন পড়ে সরকারি স্কুলে, ক্লাস টু-তে।

অনন্তর পড়াশোনা ক্লাস টু-এর গণ্ডিই পেরোতে পারেনি। বাবার মৃত্যুর পর বিদ্যালয়ের সঙ্গে তার পথচলা থেমে যায়। সংসারের তীব্র অভাব একাকী মায়ের পক্ষে আর সামলানো সম্ভব হয়নি। তবু অনন্তর মা চেষ্টার ত্রুটি রাখেননি — দুঃখ-দুর্দশার ঘূর্ণিপাকে থেকেও দুই সন্তানের মুখে অন্ন তুলে দিতে আপ্রাণ লড়ে গেছেন।

অনন্তর বাবা ছিলেন রাজমিস্ত্রি। আয় খুব বেশি না হলেও সংসার কোনো মতে ঠিকঠাক চলত।


নির্মম ভাগ্য, অক্ষত হাসি

ভাগ্য কতখানি নির্মম হতে পারে, তা অনন্তর মতো শিশুর জীবন দেখলেই হৃদয় বিদীর্ণ হয়ে যায়। অথচ আশ্চর্যের কথা — অনন্তর চেহারায় নেই দুঃখের ছায়া, নেই নিরাশার ভার। মনে হয়, সে ভাগ্যের সমস্ত কঠোরতাকে অবজ্ঞা করে হাসি-খুশি, খেলাধুলা ও গুনগুনে গানে কাজ চালিয়ে যায় নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে। ভুল হলে বকা খায়, তাতে মায়া হয়, তবু মুহূর্তেই সামলে নেয় নিজেকে।

তার গায়ের রং কালো বলে কেউ কেউ ঠাট্টা করে 'কালু' নামেও ডাকে। কিন্তু অনন্তর চোখের গভীর চাহনিতে আর মুখের গাম্ভীর্যে যেন এক অদৃশ্য উচ্চারণ শোনা যায় — "ভাগ্য যতই নির্মম হোক, আমি তাকে জয় করব।"

প্রায়ই আমি যাই সেই চায়ের দোকানে। সত্যি বলতে, চায়ের স্বাদের চেয়ে অনন্তর সঙ্গে আলাপই আমাকে টানে বেশি। তার কথাগুলোর মধ্যে থাকে এক অদ্ভুত গভীরতা। ভাবি, এ কি তার সচেতন উপলব্ধি, নাকি অচেতন উচ্চারণ? কারণ বারো বছরের শিশুর জীবনের বোঝাপড়াই বা কতটা! অথচ ওর নির্ভেজাল কথার ভেতরে আমি বারবার দর্শনের ঝলক দেখতে পাই।


পাখি ও মাছের দর্শন

একদিন মজা করে জিজ্ঞেস করেছিলাম —

"হ্যারে অনন্ত, খারাপ লাগে না তোর বয়সি বাচ্চারা যখন স্কুলড্রেস পরে দোকানের সামনে দিয়ে স্কুলে যায়?"

সে নির্লিপ্ত হাসিতে বলেছিল — "না না।"

আশ্চর্য হয়ে আবার বললাম — "কেনো?"

সেদিন অনন্ত চায়ের দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা অশ্বত্থগাছটির দিকে চাইল স্থির দৃষ্টিতে। চোখ যেন ভেদ করে দেখছিল গাছের ডালে বসা পাখিদের। তারপর শান্ত কণ্ঠে বলল —

"ওই যে পাখিগুলো, যদি তারা মাছেদের দেখে মনে করত — 'আমরাও যদি জলে পাড়ি জমাতে পারতাম' — তাহলে পাখিরাও তো দুঃখ পেত।"

বলেই হেসে ওঠে সে।

আমি সেদিন বিরক্ত হয়েছিলাম। রাগও লেগেছিল একটু। কিন্তু বাড়ি ফিরেও বহুক্ষণ তার অদ্ভুত উত্তর ভোলা যায়নি। তার আসল মর্মার্থ বুঝতে আমার ঘণ্টার পর ঘণ্টা কেটেছিল।

পাখির মতো আকাশে ওড়াটাই স্বাভাবিক, মাছের মতো জলে সাঁতার কাটা তার ধর্ম। পাখি যদি জলের জন্য হাহাকার করে, মাছ যদি আকাশের জন্য আকাঙ্ক্ষায় জর্জর হয় — তবে তাদের জীবন অবশেষে কেবল অভাবের বেদনাতেই নিমজ্জিত হবে।

বারো বছরের অনন্ত সেই মহৎ সত্যকে — যাকে বেদান্ত বলে "সন্তোষ", বৌদ্ধ দর্শন বলে "তৃষ্ণামুক্তি" — পাখি ও মাছের উপমায় নামিয়ে এনেছিল একেবারে মাটির কাছে। এবং সে জানতও না যে এটা দর্শন।


বখাটেদের শূন্যতা

একদিন দোকানে বসে চা খাচ্ছিলাম। তখন দেখি কয়েকজন বখাটে এসেছে। চা খেতে খেতে তারা নোংরা কথায় অনন্তকে বিদ্ধ করছে, এমনকি ওর মাকে নিয়েও কটুক্তি ছুড়ে দিল।

অনন্ত চুপচাপ তাদের দিকে তাকাল। চোখে এক মুহূর্তের প্রতিবাদী ঝিলিক জ্বলে উঠলেও সে কিছু বলতে পারল না। সাহস হয়তো আছে, কিন্তু শক্তি নেই।

আমি প্রতিবাদ করলে ওরা দু'একটা গালাগালি দিয়ে চলে গেল। তখন বললাম — "কষ্ট পেয়ো না বাবা, এরা সব বখাটে।"

অনন্ত ধীরে মাথা নেড়ে বলল — "না, কষ্ট লাগেনি… শুধু খারাপ লাগছে, এদের জন্য।"

"মানে?"

সে শান্ত গলায় বলল —

"দেখলেন তো, আমাকে নোংরা কথা বলে ওরা সুখ পেতে চাইছে। মানে, ওদের জীবনে আসলেই কোনো সুখ নেই। যদি থাকতো, তবে অন্যকে কষ্ট দিয়ে আনন্দ খুঁজতে হতো না।"

তারপর হাতের কাজ থামিয়ে সরল অথচ গভীর চোখে তাকাল আমার দিকে —

"ওরা আমাকে বিরক্ত করলো কেনো? কারণ এতে নাকি তাদের ভালো লাগে। আসলে তাদের ভালো লাগার মতো জীবনে কোনো সত্যিকার কাজ নেই। তাই অন্যকে আঘাত করেই সুখ খোঁজে। এজন্যই আমার খারাপ লাগে — নিজের জন্য নয়, এদের শূন্যতার জন্য।"

সেদিন আমি আর কিছু বলতে পারিনি। একটি বারো বছরের ছেলে, যার জীবনে কষ্ট ছাড়া কিছু নেই — সে নিজের অপমানকে পরের দুর্বলতায় রূপান্তরিত করে ফেলল চোখের পলকে। এই দেখার ক্ষমতা অনেক পণ্ডিতেরও নেই।


গানে বুড়ো মাইগে খায়, বৈদ্যের বুড়ো দোতলায় যায়

এইভাবেই কেটে যাচ্ছিল অনন্তর শৈশবকাল। দেখতে দেখতে আরো দুই বছর। বোন এখন ক্লাস ফোরে, পরের বছর হাইস্কুলে উঠবে। অনন্তর দরকার আরও বেশি রোজগার।

সেদিন সন্ধ্যায় জিজ্ঞেস করলাম — "এখান থেকে কাজ ছাড়লে এরপর কোথায় যাবি?"

"জীবন যেখানে নিয়ে যাবে।"

রাগে মাথা গরম হয়ে উঠল। সে কখনোই সোজা করে কিছু বলে না। "কোথাও কাজকর্ম ঠিক করেছিস নাকি?"

"না। এখনও কিছু ঠিক হয়নি। কিন্তু কিছু একটা তো করতেই হবে যাতে আয়টা একটু বাড়ে।"

"কি করতে যাবি?"

অনন্ত অদ্ভুত হাসিতে বলল — "গানে বুড়ো মাইগে খায়, বৈদ্যের বুড়ো দোলায় যায়।"

"স্পষ্ট করে বলতে পারিস না?"

শান্ত ধীরতায় সে বলল —

"যারা সঙ্গীত চর্চা করে, তারা একসময় নাম-ডাক পায়। কিন্তু সে নাম থাকে কেবল গলা ভালো থাকা পর্যন্ত। গলা নষ্ট হলে হাত পাততে হয় অন্যের কাছে। আমাদের পাড়ার সেই দাদুর কথা মনে আছে তো — শুনেছি একসময় নামকরা শিল্পী ছিলেন, আজ তাঁর অবস্থা কী। অথচ পাশের গ্রামের বৈদ্য দাদু — লাঠি ছাড়া হাঁটতে পারেন না। তবু রোগীর দরকারে একদিন পালকি করে নিয়ে গিয়েছিল মানুষ। মর্যাদা আজও অক্ষুণ্ণ। তাই আমি ভেবেছি — শিখতে হবে এমন কিছু, যা বুড়ো বয়সেও মর্যাদা কমতে দেবে না।"

শিশুর কণ্ঠে এই কথা শুনে সারাদিনের সব ক্লান্তি মুহূর্তে কোথায় মিলিয়ে গেল।


বিদায়ের পর যা থেকে গেল

এরপর আর অনন্তকে দেখিনি। কাজ ছাড়ার পরে মাত্র দু'দিন গিয়েছিলাম সেই দোকানে। কিন্তু অনন্ত ছাড়া সেখানে আর মন টেকেনি।

দুই বছরের সেই সম্পর্কে আমি অনেক কিছু দিয়েছি তাকে — হয়তো কয়েকটা পরামর্শ, কিছু উৎসাহ। কিন্তু হিসেব মেলাতে গেলে দেখি, পাওয়ার পাল্লাটা আমারই ভারী।

অনন্ত আমাকে শিখিয়েছে — দুর্ভাগ্য জীবনের প্রবাহ থামাতে পারে না। সে যেন কোনো অভিযোগ ছাড়াই স্বীকার করে নিয়েছিল — জীবন এমনই, এবং তা চলতেই হবে।

গ্রীক পুরাণে সিসিফস প্রতিদিন পাহাড়ের উপরে পাথর ঠেলে নিয়ে যায়। পাথর গড়িয়ে পড়ে। সে আবার তোলে। কোনো প্রতিবাদ নেই, কোনো অভিযোগ নেই। দার্শনিক আলবেয়ার কামু লিখেছিলেন — "সিসিফসকে সুখী মনে করতে হবে।" কারণ সংগ্রামটুকুই তার অস্তিত্বের অর্থ।

অনন্তও তাই। সে জানত না কামুর কথা, জানত না সিসিফসের কথা। কিন্তু প্রতিদিন সে সেই পাথর তুলত — কোনো ভূমিকা ছাড়া, কোনো দর্শনের তকমা ছাড়া।

জীবনের সেরা পাঠগুলো বই থেকে আসে না। কখনো কখনো সেগুলো আসে একটা চায়ের দোকান থেকে — বারো বছরের এক ছেলের কণ্ঠে, যার নাম অনন্ত।

"দুর্ভাগ্যের আঘাত নয়, বরং দৃষ্টিভঙ্গিই চিরকাল স্থির করে দেয় মানুষের সুখ বা দুঃখকে।"

🔗 এই সিরিজের অন্যান্য পোস্ট:
প্রদীপের গল্প: প্রাপ্তির মাঝেও যে শূন্যতা ভরে না
নির্মল ভিলার গল্প: অর্থ, একাকীত্ব ও জীবনের শেষ সত্য
সময়, ভাগ্য ও জ্যোতিষের রহস্য

✍️ লেখক পরিচিতি

Dr Prodyut Acharya

জ্যোতিষী, হস্তরেখাবিদ, দার্শনিক চিন্তাবিদ ও ভাগ্য উন্নতির পরামর্শদাতা। রানাঘাট, নদিয়া, পশ্চিমবঙ্গ।  myastrology.in

🌙 আজকের রাশিফল ও দিন পঞ্জিকা

জানুন আজকের রাশিফল, প্রেম, কর্ম, অর্থ, স্বাস্থ্য, শুভ সংখ্যা ও শুভ সময়।

আজই দেখুন →

🔮 ব্যক্তিগত পরামর্শ নিন

হস্তরেখা বিচার · জন্মকুণ্ডলী বিশ্লেষণ · যোটোক মিলন
Dr. Prodyut Acharya — PhD Gold Medalist · রানাঘাট

WhatsApp করুন

Razorpay দ্বারা সুরক্ষিত • UPI • Card • Net Banking

🧑‍🎓

Dr. Prodyut Acharya

PhD Gold Medalist · জ্যোতিষী ও হস্তরেখাবিদ · রানাঘাট, নদিয়া

১৫+ বছরের অভিজ্ঞতায় হাজারো জন্মকুণ্ডলী ও হস্তরেখা বিশ্লেষণ করেছেন। → আরও জানুন