বারবার ব্যর্থ হলেও জীবন থেমে থাকে না — প্রদীপের গল্প
✍️ Dr Prodyut Acharya | 📅 ১৪ মার্চ ২০২৬ | ⏱️ ৯ মিনিট
"দুর্ভাগ্যের আঘাত নয়, বরং দৃষ্টিভঙ্গিই স্থির করে দেয় মানুষের মানসিক সুখ বা দুঃখকে।"
তুমি কি কখনো এমন কাউকে দেখেছ — যার সংসার আছে, ব্যবসা আছে, সন্তান আছে — তবুও তার চোখে একটা অদৃশ্য শূন্যতা? বাইরে থেকে দেখলে মনে হয় এ মানুষটির কিসের অভাব, কিন্তু কাছে গেলে বোঝা যায় ভেতরে কোথাও একটা ক্ষত শুকোয়নি। প্রদীপ ঠিক তেমনই এক মানুষ। তার গল্প পড়তে পড়তে হয়তো তুমি নিজের জীবনের কোনো একটা অধ্যায় খুঁজে পাবে — কারণ এই যন্ত্রণা শুধু তার একার নয়, এ যন্ত্রণা আমাদের প্রজন্মের।
চাকরি না পাওয়া, প্রিয়জনকে হারানো, নিজেকে অযোগ্য মনে করা — এই অনুভূতিগুলো লক্ষ লক্ষ বাঙালি যুবকের পরিচিত। কিন্তু কেন কেউ কষ্টের মাঝেও শান্ত থাকে, আর কেউ সুখের মাঝেও অশান্ত? এই প্রশ্নের উত্তর লুকিয়ে আছে প্রদীপ আর অনন্ত — দুই যুবকের দুই জীবনের গল্পে।
প্রদীপ — যার সব আছে, তবুও কিছু নেই
গ্রামের ছেলে প্রদীপ, বয়স এখন তার ত্রিশ। নিজের স্টিল ফার্নিচারের কারখানা আছে, যেখানে বাইশ-পঁচিশ জন কর্মচারী প্রতিদিন কাজ করে। আশেপাশে তেমন প্রতিযোগিতা না থাকায় ব্যবসা দিনে দিনে বেড়ে চলেছে। দুই বছর আগে বিয়ে করেছে, এখন এক ছেলের বাবাও সে। বিয়ের সময় শ্বশুরবাড়ি থেকে বহু কিছু দেওয়ার প্রস্তাব এসেছিল — প্রদীপ সে সব নেয়নি। আত্মমর্যাদা তার স্বভাবের অংশ।
প্রদীপের বাবা ছিলেন ফরেস্ট ডিপার্টমেন্টের সরকারি কর্মকর্তা। সচ্ছল পরিবারে বেড়ে ওঠা, গ্র্যাজুয়েশন শেষ করা প্রদীপ বহুবার চাকরির চেষ্টায় নেমেছিল। বারবার ব্যর্থ হয়েছে। সেই কঠিন সময়ে আমার সঙ্গে তার পরিচয়, তারপর বন্ধুত্ব। তখন থেকেই সে আমাকে যথেষ্ট সম্মান করে।
আজ সে প্রতিষ্ঠিত। অর্থনৈতিকভাবে নিশ্চিন্ত। কিন্তু আমার সঙ্গে কথা বলতে বলতে বহুবার দেখেছি — চোখের জল সে লুকাতে পারেনি।
সেই সন্ধ্যার কথা
একদিন সন্ধ্যায় প্রদীপ হঠাৎ এসে বসল। কারখানার কাজ শেষ করে এসেছে, হাতে এখনও তেলের দাগ। কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল —
"দাদা, আপনি কি কখনো মনে করেন যে কিছু পেলেও পাওয়া হলো না?"
আমি অবাক হলাম। বললাম — "মানে?"
সে জানালার বাইরে তাকিয়ে বলল — "চাকরি যখন হলো না, ভেবেছিলাম ব্যবসা করলে হয়তো মনটা ঠিক হবে। ব্যবসা এখন ভালোই চলছে। কিন্তু মনটা..."
বাকিটুকু সে আর বলল না।
কলেজজীবনে এক মেয়ের সঙ্গে ছিল তার গভীর সম্পর্ক। চার বছরের সেই ভালোবাসা ভেঙে গিয়েছিল কেবল এই কারণে যে প্রদীপ চাকরি পায়নি। মেয়ের পরিবার তাকে মেনে নেয়নি, বিয়ে দিয়ে দিয়েছিল এক সরকারি অফিসারের সঙ্গে। চাকরি না পাওয়ার ব্যথা ও প্রিয়জন হারাবার কষ্ট — দুটো মিলে গেছে একাকার হয়ে।
তারপর থেকে সে যত পেয়েছে, তত যেন ওই না-পাওয়ার ক্ষতটা আরও তাজা হয়েছে। কারণ প্রতিটি প্রাপ্তি তাকে মনে করিয়ে দেয় — "এটা পেলাম, কিন্তু ওটা পাইনি।"
দূর থেকে সবকিছুই স্বাভাবিক, নিখুঁত মনে হলেও প্রদীপের মনের গভীরে এক ধরনের অস্থিরতা ঘনীভূত হয়ে আছে — ঠিক যেমন শান্ত জলের নিচে স্রোত বইতে থাকে।
অনন্ত — যার কিছু নেই, তবুও শান্তি আছে
তখন মনে পড়ে অনন্তের কথা।
বারো বছরের সেই ছেলে — বাবাকে হারিয়েছে, পড়াশোনা বন্ধ হয়ে গেছে, চায়ের দোকানে কাজ করতে হচ্ছে। অনন্তের জীবনে যা হারিয়েছে তার ভার প্রদীপের চেয়ে অনেক বেশি। অথচ অনন্তের চোখে কখনো সেই ভার দেখিনি। জীবনের প্রতি কোনো অভিযোগ নেই, কোনো হাহাকার নেই। সে যা পেয়েছে তাই নিয়ে চলে — নির্লিপ্তভাবে, স্বাভাবিকভাবে।
আর প্রদীপ — যার ঘরে সংসার আছে, ব্যবসা আছে, সন্তান আছে — সে প্রতিদিন একটা না-পাওয়াকে বুকের মাঝখানে আঁকড়ে ধরে জেগে ওঠে।
দুজনের মাঝের ফারাক পরিস্থিতিতে নয়। ফারাক দেখার চোখে।
অনন্ত যা আছে তা দিয়ে জীবন বানিয়েছে। প্রদীপ যা নেই তা দিয়ে জীবন মেপেছে।
দার্শনিক ব্যাখ্যা — এই পার্থক্যের কারণ কী?
এর উত্তর নিহিত আছে মানুষের অভ্যন্তরীণ দর্শনে — জীবনের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গিতে।
অনন্ত বেছে নিয়েছিল স্বীকৃতি ও গ্রহণের পথ। যা সে হারিয়েছে বা পায়নি তার জন্য হাহাকার না করে, নিজের অস্তিত্বের বাস্তবতাকেই মেনে নিয়ে সন্তুষ্ট হওয়ার চেষ্টা করেছে। এই গ্রহণই তাকে দিয়েছে এক ধরনের স্বাভাবিক শান্তি।
অন্যদিকে প্রদীপ বেছে নিয়েছে তুলনা ও আকাঙ্ক্ষার পথ। তার চোখ সবসময় নিবদ্ধ সেই অপ্রাপ্তির দিকে — চাকরি না পাওয়া, প্রিয়জনকে হারানো। তাই জীবনের প্রাপ্তি ও সাফল্যগুলো অর্থহীন হয়ে পড়ে তার কাছে।
বৌদ্ধ দর্শনে এই মানসিক অবস্থার একটি নাম আছে — "তৃষ্ণা"। যা আছে তার স্বাদ নিতে না দিয়ে, যা নেই তার দিকে মন টেনে রাখে।
জ্যোতিষশাস্ত্রে একে বলি রাহুর প্রভাব — রাহু কখনো তৃপ্ত হয় না, সবসময় আরও চায়, যা পেয়েছে তা মনে থাকে না। প্রদীপের জীবনে রাহু ঠিক এভাবেই কাজ করছে। কুণ্ডলীতে রাহুর অবস্থান বুঝলে এই অতৃপ্তির শিকড় খুঁজে পাওয়া সম্ভব — এবং সেই অনুযায়ী উপায়ও।
মার্কাস অরেলিয়াস তাঁর ডায়েরিতে লিখেছিলেন, নিজের জন্যই —
"জীবনে যা আমাদের কষ্ট দেয়, তা আসলে ঘটনাগুলো নয়, সেই ঘটনাগুলো সম্পর্কে আমাদের ধারণা।"
প্রদীপ ব্যর্থ হয়নি জীবনে — সে ব্যর্থ হয়েছে নিজের ধারণায়। চাকরি না পাওয়াটা ছিল একটি ঘটনা মাত্র। কিন্তু সে সেই ঘটনাকে পরিণত করেছে আজীবনের একটি গল্পে — "আমি অযোগ্য।"
যা বলতে পারিনি
সেদিন সন্ধ্যায় প্রদীপ চলে যাওয়ার পর অনেকক্ষণ বসে ছিলাম।
ভেবেছিলাম — ওকে বলব কি? বলব যে তুমি যা হারিয়েছ তা তোমার নিয়তি ছিল, আর যা পেয়েছ তাও তোমার নিয়তিরই অংশ? বলব যে যে মেয়ে চাকরি না থাকলে সরে গেছে, সে আসলে তোমার জন্য ছিল না?
বলিনি। কারণ এই কথাগুলো বুদ্ধি দিয়ে বোঝা যায়, বুকে ধারণ করতে সময় লাগে।
প্রদীপের একটাই কাজ বাকি আছে — যে গল্পটা সে নিজের সম্পর্কে বলে চলেছে, সেই গল্পটা বদলানো। কারণ জ্যোতিষ বলে — গ্রহ পরিস্থিতি তৈরি করে, কিন্তু সেই পরিস্থিতির অর্থ নির্মাণ করি আমরা নিজেরা। সেই অর্থ বদলে দেওয়ার ক্ষমতাও আমাদেরই।
সে যে মাটিতে ফার্নিচার গড়ে, সেই মাটিতেই সে তার ভবিষ্যৎ গড়েছে। এই স্বীকৃতিটুকুই হতে পারে তার মুক্তির প্রথম পদক্ষেপ।
"গ্রহণই প্রশান্তি আনে, আর তুলনাই বেদনার জন্ম দেয়।"
• অনন্ত — যে ছেলে কষ্টের মাঝেও অভিযোগ করেনি
• রাহু কেন মানুষকে কখনো তৃপ্ত হতে দেয় না
• জ্যোতিষ কি শুধু ভবিষ্যৎ বলে, নাকি জীবন বদলায়?
✍️ লেখক পরিচিতি
Dr Prodyut Acharya
জ্যোতিষী, হস্তরেখাবিদ, দার্শনিক চিন্তাবিদ ও ভাগ্য উন্নতির পরামর্শদাতা। রানাঘাট, নদিয়া, পশ্চিমবঙ্গ। myastrology.in