কাঠের ঘ্রাণ আর একটি নিঃশব্দ হাসি
— সুশান্তের জীবনের অসমাপ্ত গল্প
✍️ Dr Prodyut Acharya | 📅 ১৩ মার্চ ২০২৬ | ⏱️ ৭ মিনিট
"ভাগ্য বীজ বপন করে, কিন্তু সেই বীজ থেকে কী ফলবে তা নির্ধারণ করে মানুষের কর্ম।"
— Dr Prodyut Acharya
কাঠের ফার্নিচার তৈরির কাজ করে সবাই যাকে "ব্রিটিশ" নামে চেনে, তার আসল নাম সুশান্ত। এলাকার অধিকাংশ মানুষই তার প্রকৃত নাম জানে না — শুধু জানে সেই ডাকনামটি, যেটি কবে কীভাবে তার মুখে এঁটে গেছে তা আজ কেউ মনে করতে পারে না।
ছোটবেলায় সুশান্ত ছিল আমার সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ বন্ধু। একসাথে প্রাইমারি স্কুল, একসাথে হাইস্কুলে ভর্তি। ক্লাস ফোরের বার্ষিক পরীক্ষায় সে প্রথম হয়েছিল — আসলে প্রতি বছরই প্রথম কিংবা দ্বিতীয়। পরীক্ষার সময় পাশে বসলে আমার আর কোনো অসুবিধা হতো না — তার উপস্থিতিটাই ছিল এক ধরনের আশ্বাস।
কিন্তু ক্লাস সিক্সে হাফইয়ার্লি পরীক্ষার কিছুদিন পর হঠাৎই সে স্কুলে আসা বন্ধ করে দেয়। পরে খোঁজ নিয়ে জানলাম — সে আর কোনোদিন স্কুলে ফিরবে না। বাড়ির পরিস্থিতি এমন হয়ে গিয়েছিল যে পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়া তার পক্ষে সম্ভব ছিল না।
পনেরো বছর পর — কাঠের দোকানে পুরনো বন্ধু
বছরের পর বছর কেটে গেছে। শুনেছিলাম, এক ব্রিটিশ মিস্ত্রি নাকি কাঠের কাজে অদ্ভুত দক্ষ — তার হাতের তৈরি ফার্নিচারের নকশায় নাকি অন্যরকম সৌন্দর্য আছে। একদিন নিজেরই কিছু ফার্নিচারের প্রয়োজন হলো। এক বন্ধু নিয়ে গেল সেই দোকানে।
সেখানে পৌঁছে পনেরো বছর পর আমার শৈশবের বন্ধুর সঙ্গে দেখা হলো।
চেনার কোনো অসুবিধা হয়নি। তার মুখে এখনো সেই তীক্ষ্ণ বুদ্ধির ছাপ। কিন্তু এভাবে দেখা হবে — এটা কোনোদিন কল্পনা করিনি। বন্ধুকে আবার পাওয়ার আনন্দের চেয়ে তার অবস্থা দেখে কষ্টই হলো বেশি।
আমি বললাম — "আমার থেকে অনেক বেশি তোকে ভালো থাকার কথা ছিল। তোকে এই অবস্থায় মানাতে পারছি না।"
সুশান্ত শান্তভাবে বললো —
"কী করবি আমার কথা শুনে? তুই ভালো আছিস তো সেটাই অনেক।"
সে বেশি কিছু বলতে চাইলো না। কিন্তু পরে যাদের ছোটবেলা থেকে তাকে চেনা, তাদের কাছ থেকে অনেক কিছু জানলাম।
যে পরিবারের গল্প কেউ জানে না
সুশান্তের দাদু ছিলেন নামকরা ব্যবসায়ী, জ্যাঠু চাকরি করতেন সরকারিভাবে। কিন্তু সুশান্তের বাবা ছোটবেলা থেকেই ভিন্ন পথে হেঁটেছেন — নেশা, ভাং, জুয়া। দাদু ভেবেছিলেন বিয়ে দিলে ছেলে হয়তো সামলে যাবে। ব্যবসার দায়িত্বও তুলে দিয়েছিলেন। হলো উল্টোটা।
জুয়ার টেবিলে শেষ হলো পুঁজি, বন্ধক পড়লো বাড়ি, জ্যাঠুদের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন হলো। সংসার ভেঙে পড়লো।
এই টানাপোড়েনের মধ্যেই সুশান্তের পড়াশোনা থেমে গেল ক্লাস সিক্সে। সেই মেধাবী ছেলেটি — যে প্রতি বছর প্রথম হতো — তার পড়ার বইয়ের জায়গায় এলো সংসারের ভার।
বৈদিক জ্যোতিষে এটাকে বলে প্রারব্ধ কর্মের প্রভাব — পূর্বের কর্মফল যখন পরিবারের মাধ্যমে একটি শিশুর জীবনে ছায়া ফেলে। কিন্তু এই ছায়া চিরস্থায়ী নয়। পুরুষার্থ — মানুষের নিজের প্রচেষ্টা — এই ছায়াকে সরাতে পারে।
হাতের কাজ মানুষকে টিকিয়ে রাখে
স্কুল ছাড়ার পর সুশান্ত কোথাও থিতু হতে পারছিল না — কখনো খাবারের দোকানে, কখনো রঙের কাজে, কখনো ইলেকট্রনিক্সের দোকানে।
তখন পাড়ার এক দাদা বললেন —
"হাতের কাজ শেখ। হাতের কাজ মানুষকে কোথাও না কোথাও টিকিয়ে রাখবে।"
সেই থেকে কাঠের কাজ।
সুশান্তের মনোযোগ ছোটবেলা থেকেই অসাধারণ ছিল — সেই একই মনোযোগ সে এখন ঢেলে দিলো কাঠের খাঁজে খাঁজে। অল্প সময়েই দক্ষ হয়ে উঠলো। যে দোকানেই কাজ করেছে, অন্যদের চেয়ে বেশি মাইনে পেয়েছে। অনেক সময় মালিক লুকিয়ে বেশি টাকা দিতেন — কারণ সুশান্তের হাতের কাজে ছিল অন্যরকম সৌন্দর্য।
লোকমুখে কথা উঠেছিল — সুশান্ত নাকি ভীষণ কৃপণ। আসলে তার প্রতিটি পয়সা জমছিল একটি উদ্দেশ্যে — বাড়িটা ঋণমুক্ত করার স্বপ্নে। সংসারের খরচ চালিয়ে, বাবা-মাকে সামলে, একে একে জমাচ্ছিল।
সমাজ বলে কৃপণ। সত্যটা হলো — যে মানুষ নিজের ভোগ কমিয়ে অন্যের ঋণ শোধ করে, তার জন্য আমাদের ভাষায় সঠিক শব্দ নেই।
দুটি প্রেম, দুটি বিদায় — নিঃশব্দে
জীবনে দুইবার ভালোবাসার ছোঁয়া এসেছিল সুশান্তের।
প্রথমবার — মেয়েটি তাকে ভীষণ ভালোবাসতো। সরস্বতী পুজোর এক বিকেলে সে চেয়েছিল একটু সময়, একটু উপস্থিতি। সেই সময় দোকানে জরুরি কাজ, মালিক ছুটি দেয়নি। সুশান্ত যেতে পারলো না। সেই একটি না-যাওয়াই হয়ে গেল সম্পর্কের শেষের শুরু।
দ্বিতীয়বার এল এক শিক্ষিতা, গ্র্যাজুয়েট মেয়ে। সুশান্তও মন থেকে জড়িয়ে পড়েছিল। তবু নিজেই সরে দাঁড়ালো। বললো — মেয়েটি তার থেকে অনেক ভালো জীবন পাওয়ার যোগ্য। আবেগে যাকে ভালোবাসে, বিয়ে হলে সেই ভালোবাসা টিকবে না — বরং দুর্ভোগে রূপ নেবে।
এইভাবে দুটি প্রিয় মানুষকেই হারালো সুশান্ত। তার মুখে কারো প্রতি কোনো অভিযোগ নেই — আছে শুধু নিজের জীবনের প্রতি একরাশ অভিমান আর দীর্ঘশ্বাস।
সেই কথোপকথন — যা আমাকে স্তব্ধ করে দিয়েছিল
এত কষ্ট, এত ত্যাগ, তবু তার মধ্যে কোনো তিক্ততা নেই — কৌতূহলী হয়ে একদিন সরাসরি জিজ্ঞেস করলাম —
"তোর বাবার প্রতি রাগ হয় না? শেষ পর্যন্ত তো উনিই সব নষ্ট করলেন।"
সুশান্ত শান্ত গলায় বললো —
"রাগ হতো, একসময় ভীষণ রাগ। ভাবতাম — যখন সংসার চালাতে পারবে না, সন্তান মানুষ করবে না, তাহলে আমাকে জন্ম দিল কেনো? কিন্তু পরে বুঝলাম — সবটা কারো একার দোষ নয়, এটাও একরকম ভাগ্য। মানুষ ব্যর্থ হলে ভাবে, 'আমার জন্মই কেনো হলো!' আবার যখন জীবনে কিছু প্রাপ্তি হয়, সম্মান আসে — তখন মনে হয়, 'আমাকে জন্ম দিয়েছে এটাই তো আশীর্বাদ।' অবস্থার পরিবর্তনেই মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি বদলে যায়।"
আমি চুপ করে গেলাম। কিন্তু মনে প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছিল, তাই আবার জিজ্ঞেস করলাম —
"তুই এত ভালো কাজ জানিস, নিজের ব্যবসা করার কথা কখনো ভাবিসনি?"
সুশান্ত একটুখানি হেসে বললো —
"চেষ্টা করিনি তা নয়। কিন্তু বুঝলাম আমার কিছু দুর্বলতা আছে। আমি নিজের কাজে ডুবে যাই, অন্যরা কী করছে সেদিকে নজর দিই না — ফলে লোকসান হতো। শেষ পর্যন্ত ব্যবসা গুটিয়ে দোকানের কাজে ফিরে আসি। সত্যি কথা বলতে — আমার মধ্যে লিডারশিপ নেই।"
"তাহলে ভবিষ্যতের কোনো পরিকল্পনা নেই?"
"পরিকল্পনা একটাই — বাড়িটা ঋণমুক্ত করবো। আর বাবা-মায়ের সেবা করবো। এটাই আমার কর্তব্য। ভবিষ্যৎ বলে কিছু হয় না — যা হয়, সব বর্তমানেই হয়। বাবা-মা হয়তো ভুল করেছেন, কিন্তু তারা আমার বাবা-মা। আমি যদি বুদ্ধিমান হই, তাহলে আমাকেই তাদের ভুল শোধরাতে হবে।"
আমি স্তব্ধ হয়ে গেলাম।
বুঝতে পারছিলাম না — সে কি সত্যিই কর্তব্যের কথা বলছে, নাকি জীবনের ব্যর্থতা, প্রেম হারানোর বেদনা — সব মিলিয়ে নিজেকে উৎসর্গ করার মধ্যেই সান্ত্বনা খুঁজছে?
শেষবার জিজ্ঞেস করলাম — "সত্যি করে বল, তুই আসলে কী চাইছিস?"
সুশান্ত শুধু একটুখানি হাসলো।
কিন্তু সেই হাসিতে আনন্দ ছিল না — ছিল অভিমান, ছিল নিঃশব্দ বেদনা। তারপর চুপচাপ উঠে চলে গেল।
অসমাপ্ত মূর্তি — জীবনের এক অন্য সংজ্ঞা
সুশান্ত চলে যাওয়ার পর চারপাশে ভেসে ছিল কাঠের ঘ্রাণ আর নিস্তব্ধতা। হাতুড়ি-করাতের শব্দ মিলিয়ে গিয়ে এক অদ্ভুত নীরবতা নেমে এসেছিল।
সুশান্তের জীবন আমার কাছে এক অসমাপ্ত মূর্তির মতো।
যে পাথরের উপর পড়ে অসংখ্য আঘাত, ক্ষতবিক্ষত দাগে ভরে ওঠে তার শরীর — তবুও খোদাই হতে হতে একদিন জন্ম নেবে এক অপরূপ শিল্পরূপ। মানুষের চোখে সে শুধু ভাঙা পাথর, অথচ সেই ভেতরেই লুকিয়ে আছে ভবিষ্যতের মূর্তিমান সৌন্দর্য।
মানুষ তাকে চেনে কাঠমিস্ত্রি হিসেবে। সমাজ বলে "কৃপণ"। অথচ আমি জানি, তার প্রতিটি সঞ্চয় এক নীরব ত্যাগ। আর সেই শেষ প্রশ্নে সে হেসে চলে গেছে — উত্তর দেয়নি। হয়তো উত্তর জানে না। হয়তো উত্তরটা সে নিজেও আজও খুঁজছে।
তবুও ভাবি —
সাফল্য সবসময় পাওয়া নয়। সাফল্য হলো নিঃশব্দে নিজের কর্তব্য পালন করা। সাফল্য হলো আলো নিভে যাওয়ার আগে অন্যের জন্য শেষবারের মতো দীপ্তি জ্বালিয়ে যাওয়া।
আর সুশান্তের সেই থমথমে হাসির আড়ালে কী লুকিয়ে আছে — সেটা হয়তো কেউ কোনোদিন জানতে পারবে না।
"ভাগ্য বীজ বপন করে, কিন্তু সেই বীজ থেকে কী ফলবে তা নির্ধারণ করে মানুষের কর্ম।"
• কষ্ট লাগা আর থেমে যাওয়া এক কথা নয় — কনকলতার গল্প
• সবকিছুই কি পূর্বনির্ধারিত — নাকি ভাগ্য বদলানো যায়?
• সময় কেন জীবনের সবচেয়ে বড় শক্তি — জ্যোতিষের আলোয়
✍️ লেখক পরিচিতি
Dr Prodyut Acharya
জ্যোতিষী, হস্তরেখাবিদ, দার্শনিক চিন্তাবিদ ও ভাগ্য উন্নতির পরামর্শদাতা। রানাঘাট, নদিয়া, পশ্চিমবঙ্গ। myastrology.in