বাংলা মাসের নামকরণ কীভাবে হলো?
নক্ষত্র ও পূর্ণিমার অজানা রহস্য
✍️ Dr Prodyut Acharya · 📅 ২১ মার্চ ২০২৬ · ⏱️ ৭ মিনিট
"বাংলা মাসের প্রতিটি নাম আকাশের নক্ষত্র থেকে জন্ম নিয়েছে — এটি হাজার বছরের পুরনো বিজ্ঞান।"
বাংলা সাতটি বারের নাম আমরা সকলেই জানি — রবিবার, সোমবার, মঙ্গলবার, বুধবার, বৃহস্পতিবার, শুক্রবার, শনিবার। এই নামগুলি যে সাতটি গ্রহের নামে রাখা হয়েছে তা অনেকেই জানেন।
কিন্তু বাংলা মাসের নামকরণ কীভাবে হলো — এই প্রশ্নের উত্তর অনেকেই জানেন না। উত্তরটি লুকিয়ে আছে আকাশের ২৭টি নক্ষত্রের মধ্যে।
রাশিচক্র ও ২৭টি নক্ষত্র
রাশিচক্রের ৩৬০ ডিগ্রিকে ঘিরে আছে ২৭টি নক্ষত্রপুঞ্জ। সহজ অঙ্কে —
৩৬০ ÷ ২৭ = ১৩ ডিগ্রি ২০ মিনিট
অর্থাৎ প্রতিটি নক্ষত্র রাশিচক্রে ১৩°২০' জায়গা দখল করে। মেষ রাশির শুরু থেকে প্রতি ১৩°২০' অন্তর একটি করে নক্ষত্র।
সূর্যসিদ্ধান্ত ও বেদাঙ্গ জ্যোতিষে এই ২৭টি নক্ষত্রের বিস্তারিত বিবরণ আছে।
২৭টি নক্ষত্রের সম্পূর্ণ তালিকা
| # | নক্ষত্র | রাশি | # | নক্ষত্র | রাশি |
|---|---|---|---|---|---|
| ১ | অশ্বিনী | মেষ | ১৫ | স্বাতী | তুলা |
| ২ | ভরণী | মেষ | ১৬ | বিশাখা | তুলা/বৃশ্চিক |
| ৩ | কৃত্তিকা | মেষ/বৃষ | ১৭ | অনুরাধা | বৃশ্চিক |
| ৪ | রোহিণী | বৃষ | ১৮ | জ্যেষ্ঠা | বৃশ্চিক |
| ৫ | মৃগশিরা | বৃষ/মিথুন | ১৯ | মূলা | ধনু |
| ৬ | আর্দ্রা | মিথুন | ২০ | পূর্বাষাঢ়া | ধনু |
| ৭ | পুনর্বসু | মিথুন/কর্কট | ২১ | উত্তরাষাঢ়া | ধনু/মকর |
| ৮ | পুষ্যা | কর্কট | ২২ | শ্রবণা | মকর |
| ৯ | অশ্লেষা | কর্কট | ২৩ | ধনিষ্ঠা | মকর/কুম্ভ |
| ১০ | মঘা | সিংহ | ২৪ | শতভিষা | কুম্ভ |
| ১১ | পূর্বফাল্গুনী | সিংহ | ২৫ | পূর্বভাদ্রপদ | কুম্ভ/মীন |
| ১২ | উত্তরফাল্গুনী | সিংহ/কন্যা | ২৬ | উত্তরভাদ্রপদ | মীন |
| ১৩ | হস্তা | কন্যা | ২৭ | রেবতী | মীন |
| ১৪ | চিত্রা | কন্যা/তুলা |
মাসের নামকরণের রহস্য — পূর্ণিমার চন্দ্র
সূর্যসিদ্ধান্ত ও বেদাঙ্গ জ্যোতিষ অনুসারে — পূর্ণিমার রাতে চন্দ্র যে নক্ষত্রে অবস্থান করত, সেই নক্ষত্রের নামানুসারে মাসের নামকরণ হয়েছে।
সূর্য মেষাদি বিন্দু অতিক্রম করার পর বছরের প্রথম পূর্ণিমার চন্দ্র বিশাখা নক্ষত্রে থাকত — তাই সেই মাসের নাম হলো বৈশাখ।
এই নিয়মটি অত্যন্ত সুন্দর ও বৈজ্ঞানিক — চন্দ্র ও সূর্যের অবস্থান মিলিয়ে মাস গণনা করা হতো।
বাংলা ১২ মাস ও তাদের নক্ষত্র
🌕 বৈশাখ
← বিশাখা নক্ষত্র (১৬)
🌕 জ্যৈষ্ঠ
← জ্যেষ্ঠা নক্ষত্র (১৮)
🌕 আষাঢ়
← পূর্বাষাঢ়া ও উত্তরাষাঢ়া (২০-২১)
🌕 শ্রাবণ
← শ্রবণা নক্ষত্র (২২)
🌕 ভাদ্র
← পূর্বভাদ্রপদ ও উত্তরভাদ্রপদ (২৫-২৬)
🌕 আশ্বিন
← অশ্বিনী নক্ষত্র (১)
🌕 কার্তিক
← কৃত্তিকা নক্ষত্র (৩)
🌕 অগ্রহায়ণ
← আর্দ্রা নক্ষত্র (৬)
🌕 পৌষ
← পুষ্যা নক্ষত্র (৮)
🌕 মাঘ
← মঘা নক্ষত্র (১০)
🌕 ফাল্গুন
← পূর্বফাল্গুনী ও উত্তরফাল্গুনী (১১-১২)
🌕 চৈত্র
← চিত্রা নক্ষত্র (১৪)
শাস্ত্রীয় ভিত্তি
বেদাঙ্গ জ্যোতিষে (আনুমানিক ১৪০০-১২০০ খ্রিস্টপূর্ব) চন্দ্রের নক্ষত্র-ভিত্তিক মাস গণনার পদ্ধতি প্রথম লিপিবদ্ধ হয়।
"চন্দ্রমা নক্ষত্রাণাম্ অধিপতিঃ" — অথর্ববেদ
চন্দ্র হলেন নক্ষত্রের অধিপতি। চন্দ্রের গতিপথ ধরেই কাল গণনার এই প্রাচীন পদ্ধতি তৈরি হয়েছে।
সূর্যসিদ্ধান্তে (আনুমানিক ৪০০-৫০০ খ্রিস্টাব্দ) এই গণনা পদ্ধতি সম্পূর্ণরূপে ব্যাখ্যা করা হয়েছে।
অয়নচলন — কেন এখন পরিবর্তন হয়েছে?
বর্তমানে অয়নচলন (Precession of Equinoxes)-এর কারণে নক্ষত্রের অবস্থান সরে গেছে। পৃথিবীর অক্ষ প্রতি বছর প্রায় ৫০.২" করে পশ্চিম দিকে সরে যায়। এই কারণে আজকের পূর্ণিমার চন্দ্র আর সেই একই নক্ষত্রে থাকে না।
তবু মাসের নামগুলি প্রাচীন ঐতিহ্য অনুযায়ী অপরিবর্তিত রয়েছে।
বাংলা বার ও মাস — একই বৈজ্ঞানিক ভিত্তি
| গণনার ভিত্তি | বার | মাস |
|---|---|---|
| মহাজাগতিক বস্তু | ৭টি গ্রহ | ২৭টি নক্ষত্র |
| পর্যবেক্ষণের সময় | প্রতিদিন | পূর্ণিমার রাত |
| উৎস শাস্ত্র | বেদাঙ্গ জ্যোতিষ | সূর্যসিদ্ধান্ত |
প্রাচীন ভারতীয় জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা শুধু গণনার জন্য নয়, দৈনন্দিন জীবনের ভাষায় আকাশকে নিয়ে এসেছিলেন — তাই আজও আমরা যখন "বৈশাখ" বলি, আসলে বলি বিশাখা নক্ষত্রের কথা।
"আমাদের ভাষার প্রতিটি মাসের নামই আসলে একটি নক্ষত্রের নাম — আকাশ আমাদের ক্যালেন্ডারে লেখা আছে।"
• রাশিচক্রে ১২টি রাশি কেন? — উত্তরটা চাঁদের মধ্যে লুকিয়ে
• শনির সাড়ে সাতি — কী হয়, কেন হয়, কী করবেন
• রাহু ও কেতু — ছায়া গ্রহের আসল রহস্য