অরুণ মানে উদীয়মান সূর্য।
নামটা তার বাবা রেখেছিলেন ভালোবেসে। ভেবেছিলেন — এই ছেলে একদিন আলো ছড়াবে। সেই স্বপ্ন বুকে নিয়ে অরুণ বড় হয়েছে, পড়েছে, ছুটেছে।
বয়স উনত্রিশ। শহরে নিজের ব্যবসা, ছোট্ট ফ্ল্যাট, ব্যাংকে কিছু সঞ্চয়।
কিন্তু অরুণের একটাই সমস্যা।
সে কখনো তৃপ্ত হতে পারে না।
বন্ধু রাহুলের নতুন গাড়ির খবর শুনলে রাতে ঘুম হয় না। সহকর্মীর প্রমোশনে বুকে একটা চাপা জ্বালা ধরে। সোশ্যাল মিডিয়া খুললেই মনে হয় — সবাই এগিয়ে যাচ্ছে, শুধু সে দাঁড়িয়ে আছে। সে পরিশ্রম করে, পায়ও — কিন্তু পাওয়ার আনন্দ থাকে মাত্র কয়েক ঘণ্টা। তারপর আবার সেই একই শূন্যতা।
মান চাই। যশ চাই। প্রতিষ্ঠা চাই। সম্পদ চাই।
কিন্তু কতটুকু পেলে থামবে — এই প্রশ্নটা সে কখনো নিজেকে করেনি।
সেদিন ব্যবসায় বড় ধাক্কা খেল। অংশীদার বিশ্বাসঘাতকতা করল। বছরের পরিশ্রম এক ধাক্কায় মাটি। অরুণ ভেঙে পড়ল। মাথা ভার নিয়ে হাঁটছিল — অজান্তেই ঢুকে পড়ল পাড়ার এক পুরনো চায়ের দোকানে।
দোকানদারের নাম প্রদীপ।
বয়স পঞ্চাশের কোঠায়। পরনে সাধারণ পোশাক, মুখে সবসময় একটা শান্ত হাসি। দোকান ছোট, আয় সামান্য।
অরুণ এই মানুষটাকে আগে কখনো গুরুত্ব দেয়নি। মনে মনে ভাবত — এই বয়সে চায়ের দোকান নিয়ে পড়ে আছে। জীবনে কিছু করতে পারল না।
তার অহংকার তাকে দেখতে দিত না — এই মানুষটির চোখে কতটা গভীরতা আছে।
সেদিন অরুণ কোণার বেঞ্চে বসতেই শুনল পাশ থেকে কথা হচ্ছে। বৃদ্ধ রমেশ কাকা বলছেন তাঁর ছেলের কথা — বিদেশে মোটা মাইনে, বড় গাড়ি, কিন্তু বাবাকে ফোন করার সময় নেই।
"ছেলেটা এত পেল, কিন্তু সুখী হলো না প্রদীপ।"
প্রদীপ চুপ করে চায়ের কাপটা মুছলেন। তারপর আস্তে বললেন —
"যে জানে না কোথায় যাচ্ছে, তার দ্রুত ছোটার কোনো মানে নেই কাকা। দ্রুত ছুটলে শুধু ভুল জায়গায় আরও তাড়াতাড়ি পৌঁছানো হয়।"
অরুণ অজান্তেই কান খাড়া করল।
পরদিন অরুণ আবার এল। এবার সরাসরি প্রদীপের সামনে বসল। গলায় সেই পুরনো অহংকার —
"আপনাকে একটা কথা জিজ্ঞেস করি। সারাজীবন এই ছোট্ট দোকানে কাটালেন। আফসোস নেই?"
প্রদীপ একটুও বিচলিত হলেন না।
"আফসোস কীসের? তুমি কি মনে করো এই দোকানটা আমার ব্যর্থতা?"
"মানে... আপনি তো আরও বড় কিছু করতে পারতেন।"
"বড় মানে কী তোমার কাছে?"
অরুণ থামল। বড় মানে — বেশি টাকা, বড় অফিস, লোকের মুখে নাম। কিন্তু বলতে গিয়ে একটু অস্বস্তি হলো।
"বড় মানে সফলতা। প্রতিষ্ঠা। মানুষ যেন চেনে।"
"কতজন মানুষ চিনলে তুমি সন্তুষ্ট হবে? দশজন? হাজারজন? এক লক্ষ? কোথায় থামবে?"
অরুণ জবাব দিতে পারল না।
"তুমি জানো না। কারণ তুমি কখনো ভাবোনি। তুমি শুধু ছুটেছ — কারণ পাশের মানুষটা ছুটছে।"
কথাটা ছুরির মতো লাগল।
"আপনি বলতে চাইছেন আমি ভুল পথে? আপনি চায়ের দোকান চালান, সেটা ঠিক আর আমার পরিশ্রম ভুল?"
"তোমার পরিশ্রম ভুল বলিনি। তোমার মাপকাঠিটা ভুল। তুমি নিজের জীবনকে অন্যের জীবনের স্কেলে মাপছ — যেন কেউ নিজের জুতো অন্যের পায়ে পরিয়ে বলছে, দেখো কেমন ফিট হয়।"
অরুণ সেদিন রাগ করে চলে গেল।
কিন্তু বাড়ি ফিরে ফোন খুলল, রাহুলের ইনস্টাগ্রাম স্ক্রোল করল — নতুন গাড়ি, ছুটিতে পাহাড়, উজ্জ্বল হাসি। পুরনো জ্বালাটা আবার এলো।
"প্রদীপ কী বোঝে? ও তো শুধু চা বেচে।"
সে নিজেকে বোঝাল।
কিন্তু রাতে ঘুম এলো না। প্রদীপের কথাগুলো মাথায় ঘুরতে থাকল — কতজন মানুষ চিনলে থামবে?
উত্তর নেই। কখনো ভাবেনি।
ধীরে ধীরে রে মনা, ধীরে সব কুছ হোয়ে। মালী সেচে শ ঘরা, ঋতু আয়ে ফল হোয়ে। — সন্ত কবীর
মালী সারা বছর গাছে জল দেন। রাতারাতি ফল আসে না। তাই বলে জল দেওয়া বিফলে যায় না। ঋতু এলে গাছ ফল দেয় — মালীর প্রতিটি বালতি জলের ঋণ শোধ করে।
পরদিন অরুণ আবার গেল। এবার মাথাটা একটু নিচু।
"কাল রাতে ঘুমাতে পারিনি।"
"জানি। সত্যি কথা শুনলে প্রথমে ঘুম যায়। তারপর আসে গভীর ঘুম।"
"কিন্তু আমি এগোতে চাই। পিছিয়ে থাকব কেন?"
"এগোনো আর ছোটা এক জিনিস নয়। গরু মাঠে সারাদিন ছোটে — এগোয় না। নদী ধীরে বয় — কিন্তু সমুদ্রে পৌঁছায়।"
"তাহলে কী করব? হাত গুটিয়ে বসে থাকব?"
"না। আগে ঠিক করো কোথায় যেতে চাও। তারপর হাঁটো। কিন্তু এখন তুমি জানোই না কোথায় যাবে — শুধু জানো রাহুলের চেয়ে আগে যেতে হবে। রাহুলও জানে না কোথায় যাচ্ছে। তুমি একজন হারিয়ে যাওয়া মানুষকে ফলো করছ।"
এই কথাটা গভীরে গেল।
অরুণের চোখ ভিজে এলো। সে প্রথমবার বুঝল — সে এতদিন নিজের জীবন বাঁচেনি। অন্যের জীবনের ছায়া অনুসরণ করেছে।
কিছুদিন পর অরুণ একদিন বলল —
"প্রদীপদা, আপনি এত শান্ত কীভাবে? সত্যিই বলুন।"
প্রদীপ একটু থামলেন।
"আমি একটা কথা অনেক আগে মেনে নিয়েছি। এই শরীরটা আমার নয়। মাটির কাছ থেকে ধার নেওয়া — যাওয়ার সময় ফেরত দিয়ে যেতে হবে। তাহলে এই পৃথিবীতে আমার বলতে আর কী আছে?"
"তাহলে কিছুই নেই?"
"আছে। এই মুহূর্তটা আছে। তোমার সাথে এই কথোপকথনটা আছে। এই চায়ের গন্ধটা আছে। এই মুহূর্তে যদি পূর্ণ থাকতে পারি — এটাই তৃপ্তি।"
অরুণ চুপ করে রইল।
"জ্যোতিষ শাস্ত্র বলে — গ্রহ মানুষের প্রবণতা দেখায়, পথ না। শনি কষ্ট দেয়, কিন্তু কষ্ট থেকে কী শেখা হলো — সেটা গ্রহের হাতে নেই, তোমার হাতে। তোমার কুণ্ডলীতে যা লেখা আছে, সেটা তোমার সম্ভাবনা — শেষ কথা নয়। শেষ কথা লেখা হয় তোমার প্রতিটি সিদ্ধান্তে।"
একদিন অরুণ বলল —
"আপনি কী চান জীবনে?"
প্রদীপ একটু হাসলেন।
"আমি একটাই প্রার্থনা করি। আমার ইচ্ছে নয় — তোমার ইচ্ছেই আমার মনে আবির্ভূত হোক।"
"এটা কি দুর্বলের কথা নয়?"
"উল্টো। নিজের ইচ্ছে ছেড়ে দিতে পারাটাই সবচেয়ে কঠিন। যারা ধ্বংস হয়েছেন ইতিহাসে — তারা সবাই নিজের ইচ্ছাকে সবার উপরে রেখেছিলেন। আর যে বলতে পারেন — তোমার ইচ্ছেই আমার ইচ্ছা — তার হারানোর কিছু নেই।"
"গীতায় কৃষ্ণ এই কথাই বলেছেন — ফল কর্মের হাতে ছেড়ে দাও। কিন্তু কর্ম করা থামিও না।"
সেদিন বিকেলে অরুণ উঠে যাচ্ছিল।
দোকানের সামনে একটা ছোট্ট ছেলে সাইকেল চালাচ্ছে। পড়ছে, উঠছে, আবার চালাচ্ছে। মুখে আনন্দ।
অরুণ দাঁড়িয়ে গেল।
"প্রদীপদা, ওই ছেলেটা বারবার পড়ছে। তবু হাসছে।"
"হ্যাঁ। সে জানে পড়াটা পথের অংশ। গন্তব্য নয়।"
অরুণ আর কিছু বলল না।
ভেতরে কোথাও কিছু একটা বদলে গেল।
অরুণের জীবন রাতারাতি বদলায়নি। ব্যবসায় লড়াই ছিল, কষ্ট ছিল। কিন্তু একটা জিনিস বদলে গিয়েছিল।
সে আর রাহুলের প্রোফাইল দেখে রাত কাটায় না।
সে এখন প্রতিদিন নিজেকে জিজ্ঞেস করে —
"আজকে কি আমি যথেষ্ট ছিলাম?"
আর বেশিরভাগ দিনই উত্তর আসে — হ্যাঁ।
সেই "হ্যাঁ"টুকুই তৃপ্তি। যা সে এতদিন বাইরে খুঁজছিল — সেটা ছিল ভেতরেই। সবসময়।
আর প্রদীপ?
সে প্রতিদিন সকালে দোকান খোলে। চা বানায়। মানুষ আসে, চলে যায়। কেউ তাকে বিশেষ চেনে না।
কিন্তু যারা একবার বসে, একবার কথা বলে — তারা কিছু একটা নিয়ে যায়।
যার নাম হয়তো মানসিক শান্তি।
যা কোনো বাজারে বিক্রি হয় না।
তৃপ্তি কোনো গন্তব্য নয় — এটা হাঁটার ধরন। আর যা থেকে যায় — সেটা সম্পদ নয়, স্মৃতি নয়, শুধু সেই কথাগুলো — যা একদিন কারো মনে আলো জ্বেলেছিল।